কালীপুজো মানেই প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে দেবী কালিকার (Kali) করালবদনা ও ভয়ংকর মূর্তির আরাধনা। কৃষ্ণ বা নীল বর্ণের দেহ, গলায় নরমুণ্ডমালা এবং হাতে খড়্গ—মা কালীর এই সুপরিচিত রূপ আজ আমাদের চিরচেনা। কিন্তু ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় বিচারে দেবীর এই মূর্তিপূজার ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!মূর্তির বিবর্তন ও কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ: গবেষকদের মতে, দেবী কালিকা হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকেই পূজিত হয়ে আসছেন, তবে তখন তাঁর কোনো অবয়ব বা মূর্তি ছিল না। প্রাচীনকালে দেবীর আরাধনা চলত মূলত ‘যন্ত্রে’। সেনযুগের বৃহদ্ধর্ম পুরাণে কালীর বর্তমান মূর্তিরূপের উল্লেখ পাওয়া গেলেও, ষোড়শ শতাব্দীর আগে এই মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল না। প্রখ্যাত তান্ত্রিক সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই প্রথম মা কালীর বর্তমান মূর্তিরূপটি জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর আগে সাধকরা মূলত তাম্রপাত্রে বা নরকপালে যন্ত্র খোদাই করে দেবীর আরাধনা করতেন।
কালীযন্ত্রের গূঢ় রহস্য: আজও কালীপুজোয় মূর্তির পাশাপাশি ‘যন্ত্র’ অঙ্কন করা আবশ্যিক। শাস্ত্রানুসারে এই যন্ত্র হলো ‘দেবীর নগরী’। এর গঠনের তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে—বাইরের অংশটিকে বলা হয় ‘দ্বার’, মাঝের অংশটি ‘ভপুর’ ও ‘দল’, এবং কেন্দ্রবিন্দুটিকে বলা হয় ‘কর্ণিকা’। এই কর্ণিকার মধ্যবিন্দুতেই স্বয়ং দেবী অবস্থান করেন। কালীযন্ত্রের মূল কেন্দ্রটি ঘিরে থাকেন ১৫ জন মহাযোগিনী (যেমন—কপালিনী, উগ্রা, নীলা প্রমুখ), যাঁরা প্রত্যেকেই খড়্গহস্তা, নরমুণ্ডমালা পরিহিতা এবং শবাসনা। এঁরা কালীর উপদেবী এবং অত্যন্ত ভয়ংকরী। এছাড়া দেবীর পরিবারে রয়েছেন বিভিন্ন ভৈরব, বটুক, প্রেত ও ক্ষেত্রপাল।
পূজার স্থান ও মাহাত্ম্য: বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দেবী কালিকা ভিন্ন ভিন্ন নামে ও রূপে পূজিত হন। তিনি মূলত ধ্বংস ও প্রলয়ের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি। মন্দিরে নিত্যপূজার জন্য পাথর বা ধাতুর মূর্তি থাকলেও, মানত বা কুলপূজার ক্ষেত্রে অনেক সময় গাছের তলায় বা অস্থায়ী মণ্ডপে দেবীর আরাধনা করা হয়। তবে আরাধনার মাধ্যম মৃন্ময়ী মূর্তি হোক বা ধাতু—তাম্রপাত্রে সিঁদুর ও বেলপাতার ডাঁটি দিয়ে ‘যন্ত্র’ অঙ্কন করা ছাড়া কালীর উপাসনা আজও অসম্পূর্ণ। অর্থাৎ, মূর্তির আড়ালে আদি সেই ‘যন্ত্র’ সাধনাই কালীপুজোর মূল ভিত্তি।