অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা যখন ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, বর্গি হানা এবং পলাশির যুদ্ধের মতো রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত, সেই চরম সংকটে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন মরমী সাধক রামপ্রসাদ সেন (Ramprasad Sen) (১৭১৮-১৭৭৫)। তাঁর কালীসাধনা কেবল আধ্যাত্মিক তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সমকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের এক জীবন্ত দলিল।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!আর্তমানবতার আরাধনা
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাচ্ছেন, রামপ্রসাদ তখন দৈবশক্তির কাছে অন্ন প্রার্থনা করছেন। তাঁর গানে ফুটে উঠেছে জঠরের জ্বালা— “অন্ন দে গো অন্ন দে”। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষুধার্ত পেটে ধর্ম হয় না। পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দও রামপ্রসাদের এই সুরেই বলেছিলেন, “খালি পেটে ধর্ম হয় না।” রামপ্রসাদের গানগুলোতে তৎকালীন মুমূর্ষু বাংলার ছবি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘দ্বৈত শাসন’ ও রাজস্বের নামে লুণ্ঠন, অন্যদিকে অনাবৃষ্টি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট কৃষিজীবী মানুষের হাহাকারই ছিল রামপ্রসাদী পদের মূল ভিত্তি।
সামাজিক বৈষম্য ও প্রতিবাদ
রামপ্রসাদ তাঁর গানে সমাজের প্রকট বৈষম্যকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। “কেউ যায় মা পাল্কী চড়ে, কেউ তারে কাঁধে করে”—এই পংক্তির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন শ্রেণিবিভেদকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমনকি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি হয়েও তিনি রাজকীয় বৈভব নয়, বরং কুঁড়েঘরের দারিদ্র্য আর ভাঙা চালের কথা লিখেছেন। তাঁর কলমে উঠে এসেছে শাসক ও শোষিতের লড়াই। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের জমিদারি নিলাম হওয়া এবং সাধারণ ব্যবসায়ীর হাতে তা চলে যাওয়ার ঘটনাকেও তিনি তীব্র অভিমানের সুরে মা কালীর কাছে পেশ করেছেন।
সমন্বয় ও আধ্যাত্মিকতা
রামপ্রসাদের কাছে কালী ছিলেন ‘সমন্বয়ের অবতার’। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভক্তির কোনো জাত নেই। সতীদাহ প্রথার মতো কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও তিনি সরব হয়েছিলেন। তাঁর জীবনদর্শন ছিল ‘ঈশ্বর-কেন্দ্রিক’ (Dio-centric), যেখানে জাগতিক অভাব-অনটনকে ছাপিয়ে এক পরম আশ্রয়ের খোঁজ চলত। তিনি কেরানির কাজ ছেড়ে দিয়েও নিজের আত্মসম্মান ও কবিসত্তাকে বিসর্জন দেননি।
সারকথা: রামপ্রসাদ সেন কেবল একজন সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ-সচেতন শিল্পী। তাঁর গান প্রমাণ করে যে, সভ্যতা এগোলেও সাধারণ মানুষের ‘অন্নচিন্তা’ এবং দারিদ্র্যের প্রেক্ষাপট আজও বদলায়নি। তাঁর প্রতিটি পদ সমসাময়িক ইতিহাস এবং শাশ্বত মানবিক আর্তনাদের এক অনন্য সংমিশ্রণ।