ব্যস্ততাময় কর্পোরেট ইঁদুরদৌড় আর টার্গেটের চাপে যখন মানুষের রাতের ঘুম উধাও, তখন শ্রীসারদাদেবীর (Sri Sarada Devi) চিরন্তন বাণীগুলো কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং জীবনের সঞ্জীবনী মন্ত্র হয়ে ধরা দেয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর কথাগুলো আধুনিক মানুষের জীবনদর্শন ও নারীমুক্তির এক অনন্য প্রেরণা। সারদা দেবী কেবল গুরুপত্নী বা পাতানো মা ছিলেন না; তিনি ছিলেন ‘সত্য জননী’—যিনি অবলীলায় বলতে পেরেছিলেন, “আমি সতেরও মা, অসতেরও মা।”
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!শান্তি লাভের এক মহাসূত্র দিয়ে তিনি শিখিয়েছেন, জগৎকে আপন করে নিতে হলে পরের দোষ দেখা ত্যাগ করে নিজের দোষ দেখতে হয়। তাঁর মতে, কেউ পর নয়, সমগ্র জগৎটাই আমাদের। কর্মফল ভোগ অনিবার্য হলেও ঈশ্বরচিন্তা ও জপ-তপ সেই কষ্টের ভার অনেকটা লাঘব করে। তিনি গঠনমূলক মানসিকতার ওপর জোর দিয়ে বলতেন, নিন্দা বা ঠাট্টা করা সহজ, কিন্তু ভেঙে যাওয়া কাউকে গড়ে তোলা বা ভালো পথে আনা কঠিন। দয়া বা দাক্ষিণ্য কেবল শাস্ত্রীয় আচার নয়; তাঁর কাছে ১০০ জনকে খাওয়ানোর চেয়ে চোখের সামনের ক্ষুধার্ত একজনকে অন্ন দেওয়া অনেক বেশি জরুরি।
আধুনিক মনস্তত্ত্বের সহনশীলতা আর নমনীয়তাও ধরা পড়েছে তাঁর কথায়। তিনি বলতেন, “যে সয়, সে রয়।” সংসারে চলতে গেলে স্থান-কাল-পাত্রভেদে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রতিদানের আশা না করে কাউকে ভালোবাসা—এই ছিল তাঁর আদর্শ। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণেই সকলের ওপর সমান মমত্ববোধ বজায় রাখা সম্ভব।
শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীসারদাদেবীর মধ্যে স্বয়ং জগন্মাতাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ১৮৭৩ সালের ফলহারিণী কালীপূজার দিনে তিনি স্ত্রীকে দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করেন এবং তাঁকে জগতকল্যাণের পথে চালিত করেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস করতেন, সারদা স্বয়ং সরস্বতী, যিনি জ্ঞান দিতে এসেছেন। তাঁর মতে, সারদা দেবী ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি। স্বামী গৌতমানন্দজীর ভাষায়, সারদা দেবী কেবল একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব নন, বরং তিনি আধুনিক নারীর সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। ঠাকুর জগতকে মাতৃভাবের স্বাদ দিতেই যেন সারদা দেবীকে রেখে গিয়েছিলেন। মায়েরা যেমন ধুলোবালি মেখে থাকা সন্তানকে কোলে তুলে নেন, সারদা দেবীও তেমনই অভয় দিয়ে গিয়েছেন—”মনে ভাববে, আর কেউ না থাক, আমার একজন মা আছেন।”