সারা বছরই যেন রোদের দাপট। হাতে গোনা কয়েকটা মাস আসে, যখন দিনের বেলাতেও নিশ্চিন্তে ঘোরাঘুরি করা যায়। শীতের হিমেল ছোঁয়ায় রোদের তেজ নরম হয়ে আসে, আকাশ থাকে টলটলে নীল, আর মনটা আপনাআপনিই বাইরে বেরিয়ে পড়তে চায়। শীত মানেই বনভোজন, মিউজ়িয়াম দেখা, গ্রামবাংলার পথে পথে হাঁটা কিংবা ইতিহাসের গন্ধ মাখা জায়গা ঘুরে দেখা। ছুটির দিনে ঘরে বসে না থেকে যদি একটু অন্যরকম ভ্রমণের (Travel) পরিকল্পনা করেন, তবে ইতিহাসের পথে পা বাড়ানোই হতে পারে সেরা সিদ্ধান্ত। রইল এমনই কয়েকটি জায়গার খোঁজ।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!প্রথমেই গুপ্তিপাড়া। অধিকাংশ মানুষের কাছে গুপ্তিপাড়া মানেই রথযাত্রার বিশাল আয়োজন। তবে রথের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এই এলাকার বহু প্রাচীন মন্দির ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। হাওড়া-কাটোয়া লোকাল ধরে পৌনে দু’ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। সেখান থেকে অটো, টোটো কিংবা বাসে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় মঠ চত্বরে। পাঁচিল ঘেরা এই এলাকায় রয়েছে চারটি ঐতিহাসিক মন্দির—বৃন্দাবনচন্দ্র, রামচন্দ্র, কৃষ্ণচন্দ্র ও শ্রীচৈতন্য মন্দির। টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ, পৌরাণিক কাহিনির চিত্রণ আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে যে কাউকে। শোনা যায়, জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা হয়েছিল এই গুপ্তিপাড়াতেই। নবাব সিরাজের সেনানায়ক মোহনলাল ও কবিয়াল ভোলা ময়রার জন্মস্থান হিসেবেও এই জায়গা পরিচিত। চার মন্দির দেখে চাইলে বলাগড় হয়ে শ্রীপুরেও ঘুরে আসা যায়, সেখানেও রয়েছে একাধিক প্রাচীন স্থাপত্য।
এরপর ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য আর এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা চন্দ্রকেতুগড়। কলকাতা থেকে দেগঙ্গার বেড়াচাঁপা মোড় হয়ে হারোয়ার দিকে এগোলেই এই প্রাচীন জনপদের সন্ধান মিলবে। উনিশ শতকের শেষভাগে খননের সময় এখানে মৌর্য যুগের মুদ্রা, প্রাচীন ইট, তাম্র মুদ্রা ও মৃৎপাত্র উদ্ধার হয়। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এই স্থানকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। খনা-মিহিরের ঢিবি ও রাজা চন্দ্রকেতুকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকালে হারোয়া রোড স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো ধরলেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
আর এক অনন্য গন্তব্য পশ্চিম মেদিনীপুরের কুরুমবেড়া দুর্গ। খড়্গপুর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গগনেশ্বর গ্রামে অবস্থিত এই স্থাপত্য আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ল্যাটেরাইট পাথরের খিলান, প্রশস্ত বারান্দা আর মাঝখানের গম্বুজগুলি চোখে পড়ার মতো। দুর্গটির নির্মাণকাল নিয়ে নানা মত রয়েছে—কেউ বলেন গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের আমলে, কেউ আবার আওরঙ্গজেবের সময়কালের কথা উল্লেখ করেন। দুর্গ ঘুরে কাছেই থাকা মোগলমারি বৌদ্ধবিহারও দেখে নেওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এটি পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম বৌদ্ধবিহার এবং নালন্দার সমসাময়িক। চিনা পর্যটক হিউ-এন-সাং তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তেও এই বিহারের উল্লেখ করেছিলেন।
শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে ইতিহাসের এই পথচলা নিঃসন্দেহে ছুটির দিনকে করে তুলবে আরও স্মরণীয়।