ডিজিটাল যুগের গোলকধাঁধায় মানুষের মন আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির। হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন—মনকে নিয়ন্ত্রণ করা বাতাসের চেয়েও কঠিন—আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তা আরও প্রাসঙ্গিক। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজের স্বামী ত্যাগীন্দ্রানন্দ মহারাজ (Swami Tyagendranath) ভগবদ্গীতার সেই শাশ্বত দর্শনের আলোকেই বর্তমানের ‘ডিজিটাল ডিস্ট্রাকশন’ বা মনঃসংযোগের বিচ্যুতি নিয়ে এক গভীর আলোকপাত করেছেন।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!গীতার দর্শন ও বর্তমান বাস্তবতা অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ মনকে বশে আনার দুটি প্রধান উপায়ের কথা বলেছিলেন: অভ্যাস এবং বৈরাগ্য। মহারাজ মনে করিয়ে দেন, শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ব্যায়াম প্রয়োজন, মনের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, মনোযোগই একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণে পরিণত করে। অথচ আজকের যুগে ডিজিটাল হাতছানি সেই মনোযোগের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল ডিস্ট্রাকশনের ভয়াবহতা মনোবিজ্ঞানী গ্লোরিয়া জ্যানেট মার্কের গবেষণার সূত্র ধরে মহারাজ দেখিয়েছেন যে, মানুষের ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ বা মনোযোগের স্থায়িত্ব আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষার্থী গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার সময় যদি মোবাইলে একটি নোটিফিকেশন দেখে ফেলে, তবে পুনরায় সেই একাগ্রতায় ফিরে আসতে তার গড়ে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে। এই সময়টুকু ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
সমাধানের পথ: ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেস এই সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র কার্যকরী পথ হলো ধ্যান। মহারাজ জানান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মনের চিন্তাগুলোকে নির্লিপ্তভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা অর্জন করলে মনোযোগের বিচ্যুতি কমানো সম্ভব। ২০১১ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণা পত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত ‘মাইন্ডফুলনেস’ বা সচেতন ধ্যান মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ (Gray Matter) বৃদ্ধি করে। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কর্টিসল হরমোনের প্রবাহ কমিয়ে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ দূর করতে সাহায্য করে।
পরিশেষে, আধুনিক বিশ্বের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে গেলে আমাদের আবারও সেই প্রাচীন ভারতের ‘অভ্যাস’ ও ‘ত্যাগের’ দর্শনে ফিরতে হবে। প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিটের ধ্যানই হতে পারে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই অস্থিরতা থেকে মুক্তির চাবিকাঠি।